রবিবার, ১৪ Jul ২০২৪, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন

বিজ্ঞপ্তিঃ
আমাদের সিলেট দর্পণ  ২৪ পরীক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে , আমাদেরকে আপনাদের পরামর্শ ও মতামত দিতে পারেন news@sylhetdorpon.com এই ই-মেইলে ।
একবার দেখে যাওগো মা তোমার হাওরকন্যারে- পলাশ আফজাল

একবার দেখে যাওগো মা তোমার হাওরকন্যারে- পলাশ আফজাল

একবার দেখে যাওগো মা তোমার হাওরকন্যারে
– পলাশ আফজাল

একবার দেখে যাওগো মা তোমার হাওর কন্যারে- কে এই হাওরকন্যা? সুনামগঞ্জে হচ্ছে এই হাওর কন্যা। মাছ, ধান ও গান এই হাওর কন্যাকে দিয়েছে নতুন প্রাণ।সিলেট বিভাগের হাওর বেষ্টিত একটি জেলা হচ্ছে সুনামগঞ্জ।ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের কুলঘেষা প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর নৈসর্গিক অপরুপ রূপে প্রকৃতি সাজিয়েছে হাওরের রাজধানী সুনামগঞ্জ জেলাকে। সৌন্দর্য্যের ভান্ডার তাহিরপুরের পাহাড়,টিলা, সীমান্তনদী , চুনাপাথর খনি,নিলাদ্রী লেক, সমুদ্র সদৃশ্য টাঙ্গুয়ার হাওর, শিমুল বাগান, হলহলিয়ার রাজবাড়ি, লালঘাট ঝর্ণা,রাজাই ঝর্ণা, সুন্দরবন লেকসহ আরো অনেক স্থান আছে যার রূপের বর্ণনা স্বল্প পরিসরে উপস্থাপন করা কঠিন।
মরমি সাধক হাসন রাজা, বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত, বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমসহ অসংখ্য বাউল-কবিদের জন্ম এই জেলায়।হাওর কন্যা খ্যাত এই জেলার দর্শনীয় কয়েকটি স্থানের বিবরণ সংক্ষিপে উপস্থাপন করবো।

নিলাদ্রি লেক ▪️চুনা পাথরের পরিত্যাক্ত খনির লাইম স্টোন লেক। তাহিরপুর উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের টেকেরঘাট গ্রামে নীলাদ্রি লেক। লেকের চমৎকার নীল পানি, ছোট বড় টিলা আর পাহাড়ের সমন্বয় নীলাদ্রি লেককে করেছে অপার্থিব সৌন্দর্য্যের অধিকারী।এই লেক সহজে যে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করার মত।

লালঘাট ঝর্না ▪️সুনামগঞ্জ সদর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে তাহিরপুরের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেষে লালঘাট ঝর্ণা। ঝর্ণার পূর্ব দিকে হাজং সম্প্রদায়ের ছোট ছোট পরিবার নিয়ে গড়ে উঠেছে সবুজের গ্রাম নামের আদিবাসী পল্লী। চারপাশে পাহাড়ি বনজ, ফলজ ও বিভিন্ন প্রকার ফুলের গাছ। গ্রামের একপাশে ভারতীয় সীমানায় থাকা চুনা পাথরের পাহাড়।ভারতীয় লাল ঘাট ও ভারতীয় সীমানা রক্ষীবাহিনী বিএসএফ ক্যাম্প দেখা যায় খুব কাছ থেকে।

টাংগুয়ার হাওর ▪️টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জের প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। জলাবন, নীল আকাশ, পাহাড় ও চোখ জুড়ানো সবুজ এই হাওরকে অপরূপ সাজে সাজিয়েছে।হাওর কন্যার মাঝে সে যেন মেহদী পরিহিতা এক নীল কন্যা।তার অংগ নীল,তার বর্ণ নীল,তার ধর্ম নীল,তার শৈশব নীল, কৈশোর নীল,নীল তার চির যৌবনা।
শীতকালে এই হাওরে প্রায় ২৫০ প্রজাতির অতিথি পাখির বিচরণ ঘটে। পাশে মেঘালয় পাহাড়। মেঘালয় থেকে প্রায় ৩০টি ছোট বড় ঝর্ণা বা ছড়া টাঙ্গুয়ার হাওরে এসে মিশেছে ভিন্ন রঙে, ভিন্ন রূপে,ভিন্ন ডঙ্গে।

যাদুকাটা নদী ▪️বাংলাদেশের উত্তর পূর্ব সীমান্তের কোল ঘেসে বয়ে এসেছে এই নদী। স্থানীয় ভাবে রেণুকা নদী নামে আছে এর পরিচিতি। মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড় হতে বয়ে চলে যাদুকাটা নদীটি প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার বয়ে চলে গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে।নদীর এক পাড়ে দেখা যায় সবুজ বৃক্ষরাজিময় বারেক টিলা ও অন্য দিকে খাসিয়া পাহাড়। ভোর হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই নদী থেকে পাথর, কয়লা ও বালু আহরণ করে শ্রমিকরা।অসীম প্রাকৃতিক সম্পদে ভরা এই নদী।

হাছন রাজার বাড়ি▪️হাছন রাজা সে এক ইতিহাস। সুনামগঞ্জ পৌরসভার তেঘরিয়া নামক এলাকায় এই জমিদার বাড়ি। তেঘরিয়ায় সুরমা নদীর কূল ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে হাসন রাজার স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়ি। এ বাড়িটি একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান। হাসন রাজা ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার। তিনি ছিলেন একজন মরমী সাধক। হাসন রাজা জীবনে অসংখ্যা গান রচনা করেছেন।তার বিখ্যাত অনেক গান আজ অবধি লোকপ্রিয়তার শীর্ষ অবস্থান করছে। তার ব্যবহৃত কুর্তা, খড়ম, তরবারি, পাগড়ি, ঢাল, থালা, বই ও নিজের হাতের লেখা কবিতার ও গানের পাণ্ডুলিপি রয়েছে।হাছান রাজার বাড়ি সুনামগঞ্জের দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম স্থান।

ঐতিহ্য জাদুঘর ▪️ সুনামগঞ্জ পৌর শহরে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত প্রায় দেড়শত বছরের পুরাতন আদালত ভবনে যাত্রা শুরু করেছে ঐতিহ্য জাদুঘর। শহরের সুরমা নদীর পাশে ডিএস রোডে অবস্থিত আদালত ভবনটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। ৬ কক্ষ বিশিষ্ট জাদুঘরে সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, লোককবিদের পোট্রেটসহ তাদের গানের প্রকাশনা, পুরনো নানা বাদ্যযন্ত্র, হাওরের প্রাণ-বৈচিত্রের রেপ্লিকা এবং হাওরাঞ্চলের মানুষের ব্যবহারের নানা উপাদান রাখা হয়েছে।যা এই জনপদের ইতিহাস ঐতিহ্যের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে।

গৌরারং জমিদার বাড়ি ▪️জেলা সদরের ৩ কি.মি দূরে সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নে ২০০ বছরের পুরনো এ জমিদার বাড়ি। গৌরারং রাজ্যের প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন জমিদার রাম গোবিন্দ চৌধুরী। ১৮০০ সালের শুরুর দিকে ত্রই জমিদারির যাত্রা শুরু হয়। অট্টালিকায় রয়েছে ৬ টি আলাদা ভবন। এর মধ্যে রঙমহলের দেয়ালে নর-নারী আর লতাপাতার ছবি আজও দর্শকদের আকৃষ্ট করে ।

বাউল সর্ম্রাট শাহ আব্দুল করিম এর বাড়ি ▪️দিরাই উপজেলার ধল গ্রামে অবস্থিত। শাহ আব্দুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কালনী নদীর তীরে এই গ্রামের জন্মগ্রহণ করেন। মানুষের দুঃখ, দুর্দশা দেখে তা নিয়ে গান রচনা করে গেছেন তিনি। তার এইসব গানে যেমন আছে আনন্দ তেমনি আছে জীবন সংগ্রামের প্রেরণা। আর এ কারণেই তাঁকে দেওয়া হয়েছে ‘বাউল সম্রাটের’ মর্যাদা।পাঠশালায় যাওয়ার সুযোগ না পয়েও রচনা করে গেছেন কালজয়ী অসংখ্য গান। তার ভাষা শৈলী সমৃদ্ধ করেছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে।

রাধা রমন দত্ত এর সমাধি ▪️বাংলা লোকসংগীতের পুরোধা লোক কবি রাধারমণ দত্ত রচিত ধামাইল গান সিলেট ও ভারতে বাঙ্গালীদের কাছে পরম আদরের ধন। রাধারমন নিজের মেধা, দর্শন ও প্রঞ্জাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তিনি দেহতত্তব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ, প্রেম, ভজন, ধামাইলসহ নানা ধরণের কয়েক হাজার গান রচনা করেছেন। জগন্নাথপুর উপজেলার নলুযার হাওরের পাশে একটি আশ্রম তৈরি করেন। এখানে চলে তাঁর সাধনা।নলুয়ার হাওরের আশ্রমে দিবা রাত্র সাধনা ও ইষ্টনামে মগ্ন এবং অসংখ্যভক্ত পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতেন। ধ্যান মগ্ন অবস্থায় তিনি গান রচনা করে গেয়ে যেতেন।তার গান তাকে অমর করে রাখবে যুগ থেকে যুগান্তরে।

শিমুল বাগান ▪️তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর পাশে মানিগাঁও গ্রামে ১০০ বিঘা জমির উপর শিমুল গাছের বাগান। এই বাগানে অনেক লেবু গাছও রয়েছে। বসন্তকালে শিমুল বাগানের দিকে তাকালে গাছের ডালে ডালে লেগে থাকা লাল আগুনের ঝলখানি চোখে লাগে।এক দিকে মেঘালয়ের পাহাড় সারির অকৃত্রিম সৌন্দর্য্য অন্য দিকে রূপবতী যাদুকাটা নদীর তীরের শিমুল বাগানের তিন হাজার গাছে লাল ফুলের সমাহার সহজে মুগ্ধ করে যে কারো মন।

বারেক টিলা ▪️তাহিরপুর উপজেলায় বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে এই টিলা অবস্থিত।টিলার উপর থেকে মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড় দেখা যায়। বারেক টিলায় প্রায় ৪০ টি আদিবাসী পরিবার বাস করে। পাহার, বন, যাদুকাটা নদীর অপরূপ দৃশ্য এই টিলাকে করেছে আরো আকর্ষণীয়।

ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ▪️ছাতক উপজেলায় টিলা পরিবেষ্টিত এবং সুরমা নদীর পাড় ঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরাতন সিমেন্ট ফ্যাক্টরি অবস্থিত। পর্যটকদের জন্য এটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

ডলুরা শহীদদের সমাধি সৌধ ▪️ শহরের নবীনগর থেকে সুরমা নদী খেয়া পার হয়ে হালুয়াঘাট থেকে রিক্সা অথবা টেম্পু যোগে প্রায় ৫কিঃ মিঃ দূরে ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি ডলুরা শহীদ সমাধি সৌধ।১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জের ইতিহাস খুব সমৃদ্ধ। ৪৮ জন মহান বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় বহন করছে ডলুরা শহীদদের সমাধি সৌধ। পাহাড়ের পাদদেশে চলতি নদীর তীরে লুকায়িত আছে একাত্তরের রক্তত্যাগ,সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের স্মৃতি চিহ্ন।

পাইলগাও জমিদার বাড়ি ▪️জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও জমিদারবাড়ী। প্রায় সাড়ে ৫ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত তিন শত বছরেরও বেশী পুরানো এ জমিদার বাড়ী। এ জমিদার পরিবারের শেষ জমিদার ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন সিলেট বিভাগের কংগ্রেস সভাপতি এবং আসাম আইন পরিষদের সদস্য।

এছাড়াও সুনামগঞ্জে রয়েছে অসংখ্য খাল,বিল,নদী,নালা ও ছড়ার সমাহার। রয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওরের উত্তর পাড়ে শহীদ সিরাজ লেক, স্বাধীনতা উপত্যকা,লাকমা ছড়া, মহেষখলার মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ, বারিক টিলা, শাহ আরেফিনের (র.) আস্তানা, শ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর মন্দির,।গৌরারং জমিদারবাড়ি, দোহালিয়া জমিদারবাড়ি,সুখাইড় জমিদারবাড়ি, হলহলিয়া রাজবাড়ি, ভাটিপাড়া জমিদারবাড়ি,বাঁশতলা শহীদ মিনার ও বীর শহীদদের কবরস্থান, টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ড, সীমান্তনদী খাসিয়ামারা, আদিবাসী পল্লী ঝুমগাঁও।

এক কথায়,হাওর কন্যা সুনামগঞ্জ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যের এক লীলাভূমি।বর্ষার মৌসুমে এই জেলার এক একটি গ্রামকে দেখতে এক একটি দ্বীপ মনে হয়।আরব সাগরের বুকে জেগে উঠা মালদ্বীপের মত সুনামগঞ্জের বর্ষার প্রকৃতি।তাই ভ্রমণ প্রিয়দের প্রতি আহবান -“একবার দেখে যাওগো মা তোমার হাওর কন্যারে।”

পলাশ আফজাল
সম্পাদক – সিলেট দর্পণ
polashafzal@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায়..

© স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ সিলেট দর্পণ ।